Directly contributed to the IT skills development of around 20,000 people and indirectly around 30,000 people. The opportunity to play a role in the branding and business development of over 200 organizations

Get In Touch

করোনার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে? যখন পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিল। আমি তখন দেশের অন্যতম বৃহৎ গ্রুপ ‘অমিকন গ্রুপ’-এর একটি কনসার্ন বইবাজার.কম-এর সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। সেই সংকটময় সময়ে আমরা কীভাবে টিকে ছিলাম এবং কেন আমার মনে হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতেও আমাদের একই রকম ‘সারভাইভ্যাল মোড’ অন করা প্রয়োজন, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

যুদ্ধ বা বড় কোনো সংকটের সময় ‘সারভাইভ্যাল মোড’ (Survival Mode) অন করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ব্যবসায়িক ভাষায় একে অনেক সময় ককপিট মোড বলা হয়—যেখানে আপনার পুরো ফোকাস থাকে শুধু বিমানটিকে নিরাপদে ল্যান্ড করানোর ওপর, বিমানে কতজন যাত্রী আছে বা খাবার কী দেওয়া হচ্ছে সেদিকে নয়।

সারভাইভ্যাল মোডের ৩টি মূল স্তম্ভ

১. বার্ন রেট কমানো (Minimize Burn Rate)

আপনার ব্যবসার পকেট থেকে প্রতি মাসে যে টাকাটা বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটাকে যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন, বড় অফিস ভাড়া বা বিলাসবহুল কোনো প্রজেক্ট এই মুহূর্তে বিসর্জন দিতে হবে। লক্ষ্য হবে—যতদিন সংকট কাটছে না, ততদিন যেন আমার জমানো টাকা দিয়ে ব্যবসা টেনে নেওয়া যায়।

২. মূল সক্ষমতা রক্ষা করা (Protect Core Assets)

আপনার ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ:

  • আপনার দক্ষ কর্মী, যারা কঠিন সময়েও আপনার সাথে আছে।
  • আপনার লয়াল কাস্টমার, যারা বিপদেও আপনার ওপর ভরসা করছে।
  • আপনার সাপ্লাই চেইন, যা সচল রাখা জীবনরেখার মতো।

বাকি সব কিছু (যেমন: ব্র্যান্ডিং, এক্সপেনশন, নতুন নিয়োগ) সেকেন্ডারি।

৩. দ্রুত সিদ্ধান্ত ও নমনীয়তা (Agility)

সারভাইভ্যাল মোডে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার চেয়ে ‘শর্ট-টার্ম গোল’ বেশি কার্যকর। আগামী এক সপ্তাহ বা এক মাস কীভাবে পার করবেন, তার ওপর জোর দিন। পরিস্থিতি বুঝে পলিসি পাল্টাতে যেন আপনার এক মুহূর্ত দেরি না হয়।

করোনার সংকট বনাম বর্তমানের চ্যালেঞ্জ

করোনার সময় চ্যালেঞ্জ ছিল টোটাল শাটডাউন। আর এখনকার চ্যালেঞ্জ হলো—সবকিছু খোলা থাকবে, খরচ বাড়বে স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ, কিন্তু আয় কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকবে তা অনিশ্চিত। এই অবস্থায় পকেটের টাকা বাঁচিয়ে ব্যবসা সচল রাখাই এখনকার প্রধান যুদ্ধ।

অমিকন গ্রুপের Survival Tactics টা শেয়ার করছি:

১. পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনা (Plan A, B & C)

আমরা হুট করে সব বন্ধ করিনি, বরং পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম:

  • প্রথম মাস: আমরা মানবিক দিক বিবেচনায় সবাইকে বাসায় রেখে স্যালারি দিয়েছি (অমিকনের মাসে শুধু স্যালারিই ছিল ১৭ কোটি টাকা!)।
  • দ্বিতীয় মাস (Plan-B): আমরা রিসোর্স অপ্টিমাইজেশনে গেলাম। যারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ছিল কিন্তু তাৎক্ষণিক কাজে আসছিল না, তাদের তালিকা করে বাদ দিতে হলো।
  • ১৫ দিন পর (Plan-C): আমরা শুধু সবচাইতে ডায়নামিক পারসনদের রাখলাম, যারা একেকজন ৩-৪টি দায়িত্ব সামলাতে সক্ষম।

২. ফিক্সড কস্ট বা স্থায়ী খরচ কমানো

পল্টনে আমাদের ৮টি বিশাল বিল্ডিং ছিল। আমরা ৩ মাসের পর থেকে ৪টি ছেড়ে দিয়ে জায়গা সংকুচিত করি। এতে বিশাল অংকের ভাড়া বেঁচে যায়। এছাড়া বাড়িওয়ালাদের সাথে নেগোসিয়েট করে ৫% ভাড়া পরিশোধ করে, বাকি ভাড়া পরে পরিশোধ করার ব্যপারে ম্যানেজ করে নিয়ে রিজার্ভকে সংরক্ষন করেছি।

৩. ভেন্ডর ও পার্টনার ম্যানেজমেন্ট

যাদের সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, তাদের আগের পাওনার মাত্র ৫% পেমেন্ট করে আমরা নতুন কাজ শুরু করি। এতে ভেন্ডরদেরও কাজ চলল, আমাদের বিজনেসও সচল থাকল, আবার বড় অংকের ক্যাশও হাতে থাকল।

৪. ব্র্যান্ডকে জীবনের অংশ করে তোলা

ব্যবসা মানে শুধু বিক্রি নয়। আমরা এমন সব অনলাইন অ্যাক্টিভিটিস প্ল্যান করেছিলাম যাতে মানুষ এই কঠিন সময়েও আমাদের ব্র্যান্ডকে তাদের প্রাত্যাহিক জীবনের একটি অংশ মনে করে। অর্থাৎ, বিপদের বন্ধু হিসেবে ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা সেই ঝড়ের আগের পূর্বাভাসের মতো। যারা উদ্যোক্তা, তারা এই মুহূর্তে নিচের বিষয়গুলোতে কঠোর হোন:

  • রিজার্ভ ফান্ড রক্ষা করুন: এই মুহূর্তে দামী কোনো কোর্স কেনা, অপ্রয়োজনীয় নেটওয়ার্কিং প্রোগ্রাম বা বড় কোনো ইভেন্ট করে হাতের টাকা নষ্ট করবেন না। সামনে সময় আরও কঠিন হতে পারে।
  • অপারেশনাল খরচ কমান: অফিস স্পেস ছোট করা বা অপ্রয়োজনীয় স্টাফ ছাঁটাইয়ের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করবেন না।
  • ক্যাশ ফ্লো ধরে রাখুন: আয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বড় বিনিয়োগে যাবেন না। মনে রাখবেন, ব্যবসার রক্ত হলো নগদ টাকা (Cash)।

💡 একটি গুরুত্বপূর্ণ টিপস: সারভাইভ্যাল মোড মানে কিন্তু ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং “কম জ্বালানিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি।” যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তখন আপনার হাতে যদি পর্যাপ্ত নগদ টাকা এবং একটি দক্ষ টিম থাকে, তবে আপনি অন্যদের তুলনায় ১০ গুণ দ্রুত গতিতে এগোতে পারবেন।

আমরা কেউ জানি না পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে। অমিকনে আমরা জানতাম না বিশ্ব কবে ঠিক হবে, তাই টাকা থাকা সত্ত্বেও আমরা সারভাইভ্যাল মোডে গিয়েছিলাম। আজ আপনি যদি আপনার রিজার্ভ ফান্ড বাঁচিয়ে রাখতে না পারেন, তবে সামনের সমূহ বিপদে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সারভাইভ্যাল মোড অন করুন। কম জ্বালানিতে দূরে যান। ঝড়ের পর আবার উড়তে প্রস্তুত থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *